পিলসুজ শব্দটি বাংলা ভাষায় এসেছে আরবি+ফারসি মিশ্রিত শব্দ ফতীলহ-সোজ শব্দ থেকে। যার অর্থ প্রদীপ রাখিবার স্তম্ভের তুল্য আধার। (অভিধান রাজ শেখর বসুর চলন্তিকা)।
সুতরাং শত-সহস্ত্র, শত-লক্ষ চমৎকার বইগুলি মিলে বইমেলা হতে পারে, সে মেলা স্তম্ভের তুল্য আধার, যাতে প্রদীপ (বই পড়ে জ্ঞানের আলো জ্বালানো) রাখিবার একটি সুনির্দিষ্ট বইমেলা, আজকের পৃথিবীতে সভ্য মানুষের, চিন্তক মানুষের, মুক্তমনের মানুষের দ্বারা আয়োজিত এক উৎকৃষ্ট নাম বইমেলা। বইমেলা পাঠক সৃষ্টি করবেই, সব দেশেই করে। বই যেভাবেই বিক্রি হোক, ভর্তুকি বা ভর্তুকিহীন, অথবা স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে আলমারিতে শোভন দৃশ্যের জন্যে হলেও বই কিন্তু সেই আলমারি লুঠ হওয়ার পক্ষ, যথেষ্ট চেতনাসম্পন্ন ডাকাতিরও সম্ভাবনা থাকে; অর্থাৎ বই মুদ্রণের পর পাঠকের তৃষ্ণা মেটাতে যাবেই, যার যেমন লেখার ক্ষমতা সে বইয়ে লিপিবদ্ধ করবেই এবং পাঠকও তার নিজের ভাবেই চেতনায় সমৃদ্ধ হতে চাইবে বইটি পড়েই, না পড়ে নয়। লেখকই পাঠক এবং উপযুক্ত পাঠক বলা যায়, কারণ বড়ো লেখকদের কবিদের মধ্যে বই পাঠহীন কেউ নেই, কখনো ছিল না। জানার আগ্রহেই নিজের অভিজ্ঞতার পরীক্ষা দেবেন, এতে সন্দেহ নেই।
একটি প্রশ্ন সব দেশেই বর্তমান পৃথিবীতে, লেখাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার তাগিদ কতটা জরুরী! কিন্তু পেশা হিসেবে গ্রহণ করার ভেতর বইমেলা কথাটি আসছে কেন ! লেখকের পেশা যদি বইলেখা হয়, তাহলে নিশ্চয়ই তেমন প্রকাশকের প্রয়োজন। রাজ্যের বহু বহু প্রকাশকেরা যদি সারা বছর স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তক ও নোট বই বের করায় ব্যস্ত থাকে তবে সাহিত্যিক সেপথে হাঁটবে কেন ? সাহিত্যের বই কবিতার বই যারা বের করেন, সেইসব প্রকাশক শুধুমাত্র বইমেলার প্রকাশকই নন, সারা বছরের প্রকাশক, বহু বছরের বহু যুগের প্রকাশক। তারা গ্রন্থস্বত্ব মেনে লেখকের সঙ্গে চুক্তি করেন, বিনিময়ে অর্থ দেন, বই বাজারে ছাড়েন, সংস্করণ বাড়াতে থাকলে গ্রন্থস্বত্ব নিয়ম মেনে রয়ালিটি লেখকেরা পেতে থাকেন ইত্যাদি। ভারতের খ্যাতিমান প্রকাশনাগুলি তো এই নিয়ম মেনে চলে। সারা বিশ্বেই গ্রন্থস্বত্ব ব্যবস্থা মেনে মেনে প্রকাশকরা লেখকের বই ছাপিয়ে ব্যবসা করেন এবং লেখককে জানিয়ে দেন তার কত কপি বই ছাপা হলো এবং তিনি কত টাকা পাবেন ইত্যাদি।
এ রাজ্যে যারা লোহার খাঁচায় সোনার পাখি হয়ে বসবাস করেন, তারাই লেখক। মাস মাস বেতন পাবেন, অঢেল বেতন এখন। কোন দুঃখে প্রতিবাদী বই লিখে গভীর জঙ্গলে বদলি হতে চাইবেন। পেশা বা Occupation হলো এই যে, পেশাকে গভীরভাবে ভালোবাসতে হয়। সেই ভালোবাসা অনেকরকম, অনেক প্রকারভেদ। এ রাজ্যে বেঁচে থাকতে গেলে শুধুমাত্র লেখাকে পেশা বা Occupation করে বেঁচে থাকা যায় না।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, আমার সপরিবারে বেঁচে থাকার সারাদিনের সংগ্রামটি, লেখাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার মতো যাবতীয় জেদ ও একধরণের সহ্যশক্তি আমাকে বেপরোয়া করে তুলেছে। বিগত ৫৫ বছর ধরে এই পেশাকে আমি সর্বচৈতন্যে গ্রহণ করে চলেছি বলে আমার বন্ধুদের (চাকুরিজীবি, সরকারি) জীবনযাত্রার মানের চেয়ে অনেক নীচ দিয়ে বয়ে চলেছি, কিন্তু কখনই মনে হয়নি এই একগুঁয়েমি লেখার পেশা আমাকে কিছু দেয়নি। আমি সংসার পেয়েছি, বৃদ্ধা মাকে পেয়েছি, স্ত্রী-পুত্র পেয়েছি, ভালোবাসার আদর-কদর পেয়েছি।
যা বলতে চেয়েছিলাম, তা উল্লেখ করছি। এ রাজ্যে বিখ্যাত ভারবী প্রকাশন সেই, নেই সিগনেট, রূপা অথবা ত্রিপুরায় নেই ফেভার এন্ড ফেভার যা টিএস এলিয়টের মতো নোবেলজয়ী কবির প্রকাশন সংস্থা বা পেঙ্গুইন।
তা হলে লেখার পেশা কী ? পিষ্ট হওয়ার জন্যে ? অর্থাৎ বই লিখব, প্রকাশক সেই বই ছাপতে আসবে, অথচ টাকা দিতে হবে লেখককে (অনেকের ক্ষেত্রে) বই বের হলে ১০ কপির বেশি নয়, সেই ১০ কপি বন্ধুদের জন্যে হলেও পেতে গেলে জুতোর ক্ষয় স্বীকার করে নিতে হয়। আমার স্থির বিশ্বাস, প্রকৃত লেখক-কবিদের আত্মসম্মানবোধ বেশি। কবি লেখক না হয়েও আমি জীবনে বহু মানুষ দেখেছি যারা দেহে-মনে অপূর্ব সুন্দর, অথচ তেমন বিদ্যাশিক্ষা নেই স্কুল-কলেজের। কিন্তু নিজেদের ছেলে মেয়েদের শিক্ষিত করতে চান। বইমেলায় ঘুরলে এমন বহু মানুষ পাওয়া যায় যারা বিদ্যার আগ্রহী। বই নিয়ে নাড়াচাড়া করেন। পড়তে চান, জানতে চান, বুঝতে চান জীবনের নানা অভিজ্ঞতার গল্প কথা।
৪১তম আগরতলা বইমেলা-২০২৩, এবারে স্টলের সংখ্যা বেড়ে ১৯০টি দরখাস্ত পড়েছে, কিন্তু ১৫টার মতো স্টলের ব্যবস্থা হয়নি। অনলাইনে লটারী করে স্টলগুলি বন্টন করা হয়েছে। সবচেয়ে বড়ো কথা বইমেলার এক উপযুক্ত ও পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে যে ব্যবস্থা করা হয়েছে তা এককথায় অসাধারণ চিন্তাস্রোতের প্রতিফলন। খাবার-দাবার ও আড্ড ার জন্যে জলাশয়ের পার ব্যবহার করা হয়েছে। রাত্রির প্রথম ভাগে, আলোর মালায় ভরে গেছে, প্রতিবারের মতো এবারও হাঁপানিয়ার এই মেলা চতুর। পারিপার্শ্বিক চেতনা কাজ করছে, এবং প্রতিবছর এই দিকটি লক্ষ রেখে বইমেলা প্রাঙ্গণ জনস্বার্থে বইক্রেতাদের স্বার্থে এই আয়োজন চোখে পড়ার মতো।
এবারের ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে বাংলাদেশ থেকে বইমেলায় অংশগ্রহণে সরকারের ভূমিকাও প্রশংসনীয়। প্রতিদিন সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাতে কোন বিঘ্ন না ঘটে এর জন্যে বইমেলা চত্বরে গতবার থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় মঞ্চের ব্যবস্থাই আকষর্ণীয় হয়েছে। ভিড়কে ভাগ করার এই প্রকৌশলে আইসিএ’র বিরাট ভূমিকা আছে। রাতদিন কাজ করে এই ৪১তম বইমেলাটিকে প্রাঞ্জল ও উজ্জীবিত করে তোলার ক্ষেত্রে আইসিএ’র কর্মীদের তৎপরতা প্রশংসনীয়।
আগরতলার ঘিঞ্জি অঞ্চল থেকে একটু দূরে এই ব্যবস্থাটি ‘কন্ঠে পারিপার্শ্বিকের মালা” পরানোর কাজটি সকল ক্রেতা-বিক্রেতাকে মুগ্ধ করে রেখেছে। বইমেলা দীর্ঘজীবি হোক। কারণ এই হলো এমন অপ্রতিরোধ্য মননশীলতার সভ্যতার পিলসুজ যা আগামীর সমস্ত পাঠক, তরুণ-তরুণীদের মনে মুক্ত চিন্তার পথ প্রশস্ত করে তোলে।
