বিয়ের দেনমোহরে টাকা পয়সা বা গয়না নয়, ১০১টি পছন্দের বইয়ের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের এক কনে। বরও দোকানে দোকানে ঘুরে জোগাড় করেছেন সেগুলো। আহা, কোনও বইয়ের পাতা থেকেই যেন উঠে এলেন তারা। কে জানে অতঃপর গল্প কবিতা পড়েই তারা কাটিয়ে দেবেন অনন্ত সময়। যে বইগুলো এখনো বাকি, তারাও ক্রমে ঢুকে পড়বে ঘরকন্যার মধ্যে। একেই বলে সত্যি হলেও গল্প। বই যাদের টানে তারাইতো গল্পের চরিত্র আজ। কলকাতার একটি বহুল প্রচারিত বাংলা খবরের কাগজে প্রকাশিত এই শব্দবন্ধ নিশ্চয় অনেকে পড়েছেন। ঘটনাটি হৃদয়ঙ্গম করেছেন। নিজের মতো করে ভেবেছেন। আলোচনা সমালোচনা করেছেন। ঘটনার পক্ষে বিপক্ষে মতামত দিয়েছেন। কেউ হয়তো বলেছেন দারুণ ঘটনা। ঘরে ঘরেই যেন এমন কন্যা সন্তান আসে। বরও যেন হয় এমন উদার মনস্ক। মনে মনে বরবধূকে সাধুবাদও জানিয়েছেন তারা। কেউ হয়তো বলেছেন, ন্যাকামি। আত্ম প্রচারের জন্যই এমন অদ্ভুত আব্দার। গল্পের বই পড়ার এত ইচ্ছে থাকলে বিয়ের পর কিনলেইতো হতো। কোনও ঘটনা ঘটলে পক্ষে বিপক্ষে মতামততো থাকবেই। এটাই স্বাভাবিক। তবে এটা সত্যি, এমন ঘটনার কথা আগে কখনো শোনা যায়নি। মানুষ সবসময়ই আশাবাদী। ইতিবাচক কোনও কিছু করার স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে। এজন্যই মানব সভ্যতা ক্রমশ: উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ৪২ বছর আগে একবুক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে রাজ্যের মানুষকে সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে সংপৃক্ত করতে শুরু হয়েছিল আগরতলা বইমেলা। ১৯৮১ সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবন প্রাঙ্গণে ক্ষুদ্র পরিসরে আয়োজিত বইমেলা শিশু উদ্যান, উমাকান্ত একাডেমি প্রাঙ্গণ হয়ে শাখা প্রশাখা বিস্তার করে আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
এক সময়ে আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠান বলতে ছিল আত্মীয় পরিজন, পাড়া পড়শি, বন্ধুবান্ধবের বিয়ে। একটু স্বচ্ছল পরিবারে নবজাতকের মুখেভাত বা অন্নপ্রাশন। বাচ্চাদের জন্মদিন পালন করা ছিল একান্তই ঘরোয়া অনুষ্ঠান। দেশভাগ, নতুন করে জীবন জীবিকার সন্ধান করতে যাওয়া মানুষের আয় ছিল সীমিত। ম্যারেজ ডে বা বিবাহ বার্ষিকী, ঘটা করে সন্তানের জন্মদিন পালনের কথা কেউ ভাবতেই পারতোনা। বিয়ে বাড়িতে নবদম্পতিকে আশির্বাদ করে গৃহস্থালির জিনিসপত্র, গল্পের বই উপহার দেওয়ারই প্রচলন ছিল বেশী। গল্পের বইয়ের ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্রই ছিল প্রথম পছন্দ। পরিনীতা, পল্লীসমাজ, পথের দাবী, দেবদাস, দেনাপাওনা, শ্রীকান্ত যেন তাদেরই জীবনের ছবি। রামায়ণ, মহাভারত, সুখে ঘরকন্যা করার উপদেশমূলক বই, আধ্যাত্মিক বই উপহার দেওয়ারও প্রচলন ছিল। ঘরকন্যার ফাঁকে শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম পড়েই সময় কাটাতেন তারা। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এসব উপহার আর দেখা যায়না। বিয়েতে বই উপহার দেওয়া এখন সেকেলে, ব্যাকডেটেড।
হাল আমলে বিনোদনের উপকরণের কোন অভাব নেই। চাইলে হাতের কাছে বিনোদনের অনেক উপকরণই পাওয়া যায়। কিন্তু হাতে গোনা কয়েকটি বাড়ি ছাড়া কোন বাড়িতেই লাইব্রেরীর কার্ড খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক সময়ে অনেক পরিবারেই টাকা জমা দিয়ে লাইব্রেরীর কার্ড করা হতো। সেই কার্ড দিয়ে বাবা মা, সন্তানরা গ্রন্থাগার থেকে পছন্দের বই আনতেন। বই পড়ে লাইব্রেরীতে জমা দিয়ে আবার নতুন বই আনতেন। ছাত্রছাত্রীরা বই আনতো তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার থেকে। সে সবই এখন অতীত। সাহিত্য নয়, প্রায় সবাই এখন ‘কাজের’ বইয়ের পেছনে ছুটছে। অনেকেই মনে করছেন জীবনের কঠিন লড়াইয়ে জিততে গেলে এটাই একমাত্র পথ।
বর্তমানে সামাজিক অনুষ্ঠানের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। সেইসব অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আমরা স্বজনদের হাতে তুলে দিচ্ছি নামীদামি নানা উপহার। দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতেই হচ্ছে উপহারের দীর্ঘ তালিকায় বই এখন ব্রাত্য। ঐসব সেকেলে রীতি আজ অচল। সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে, নবপ্রজন্মের জন্য আমরা কিছুটা সেকেলে হলে কেমন হয়? বিয়ে, বিবাহ বার্ষিকী, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষ, ঈদ, ভাইফোঁটা, জামাই ষষ্ঠী এসব অনুষ্ঠানে নানা উপহারের সঙ্গে একটি বইওতো দেওয়া যেতেপারে। সবাই মিলে চেষ্টা করলেই আমরা গড়ে তুলতে পারি এমন একটি সামাজিক রীতি। এভাবে কয়েক বছরেই প্রতিটি বাড়িতেই গড়ে উঠতে পারে ছোট একটি বইঘর। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সৃষ্টি করা যেতে পারে সাহিত্য পড়ার আগ্রহ।
আমরা জানি গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক প্রভৃতি রচনার শেকড় ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেই। মানুষের জীবনের নানা ঘটনা, মান অভিমান, চাওয়া পাওয়া, দু:খ দুর্দশার কথা লেখকের বলিষ্ঠ লেখনির মাধ্যমেই ফুটে উঠে বইয়ের পাতায়। আগামী ২৪ মার্চ থেকে হাঁপানিয়ায় আন্তর্জাতিক মেলা প্রাঙ্গণে শুরু হবে লেখক প্রকাশক পাঠকের মিলন মেলা। মননের উৎসব আমাদের আগরতলা বইমেলা। মেলার এই ক’দিন বন্ধুবান্ধব, প্রেমিক প্রেমিকা, নববধূ ও বর, নবীন প্রবীণ, নানা পেশার মানুষ সমবেত হবেন বইমেলায়। তারা ভীড় করবেন স্টলে স্টলে, তাদের পছন্দের বই কিনতে। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার দেওয়ার মতো আমরা যদি একে অন্যের হাতে তুলে দিতে পারি একটি পছন্দের বই, তবে বেশ ভালোই হবে। বাড়বে বইঘরের আয়তন। ফিরে যাই তাদের কথায়। ‘দেনমোহর’ হলো মুসলমান সমাজে বিয়ের একটি প্রথা। বিয়েতে স্ত্রীকে দেওয়া স্বামীর উপহার বা যৌতুক। সোনাদানা, টাকাপয়সা যৌতুক দেওয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশের ঐ যুবক-যুবতী একটি নতুন পথের পথ দেখিয়েছে। সেই ঘটনা সত্যি হলেও গল্পের মতো। সত্যিই তাই, এই ঘটনা গল্প হলেও সত্যি।
