🚨🧧বই বিচ্যুতি ঠেকায়, বই আভিজাত্যেরও প্রতীক ।। দেবাশিস মজুমদার।।

গুটি গুটি পায়ে আগরতলা বইমেলা চার দশকের যাত্রা অতিক্রম করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই শহরের সাংস্কৃতিক আঙ্গিনায় প্রধান মাত্রা যোগ করেছে আগরতলা বইমেলা। সময়ের সারণী বেয়ে রবীন্দ্র ভবন চত্বর থেকে শিশু উদ্যান ও উমাকান্ত প্রাঙ্গণ হয়ে আগরতলা বইমেলা এখন থিতু হতে চলেছে হাপানিয়া আন্তর্জাতিক মেলা প্রাঙ্গণে। বইমেলার বিস্তার এখন নিছক আগরতলাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এর শাখার বিস্তার ঘটছে রাজধানীর গন্ডি ছাড়িয়ে মহকুমা শহর গুলিতেও। এবছরও তার বাতিক্রম হচ্ছে না। ছাপানো বইয়ের পাঠকের সংখ্যা কতটা বেড়েছে তা অনুমান নির্ভর তথ্য হলেও প্রতি বছরে প্রকাশক কিংবা প্রকাশনার সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিক্রির বহর বৃদ্ধি দেখে অন্তত: এই অনুমান করাটা অনুচিত হবে না যে পাঠকের সংখ্যাও বেড়েছে। বহিঙ্গরাজ্যের প্রেক্ষাপটে তো বটেই, আমাদের ক্ষুদ্র রাজ্য ত্রিপুরার প্রেক্ষাপটেও এই সত্যটা বাস্তব। মোবাইল আর কম্পিউটারের সর্বব্যাপী আধিপত্যের যুগেও ছাপানো বইয়ের কদর কমেনি, তা হলফ করেই বলা চলে।
বইমেলা মানেই লেখক ও প্রকাশকদের তথা বইয়ের বাৎসরিক পার্বন কিংবা মিলন উৎসব, যা দেখতে প্রতিদিন হাজির হন হাজারে পাঠক। আর ভক্তির ন্যায় জ্ঞানের অসীম সাগরে অনায়াসে ডুব দিয়ে সকলে তুলে আনেন অমূল্য সব ধনরত্ন সদৃশ জ্ঞানভান্ডার, যা ভাবী কালের অনন্ত জীবনে চলার পথে দিশারী হয়ে উঠে আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক কিংবা পারিবারিক জীবনে। ফরাসী কবি চার্লস বাউডেলেয়ার বলেছিলেন- একটি বই একটি বাগান, একটি চারা, একটি স্টোরহাউস, একটি পার্টি, একটি সংস্থা, একজন উপদেষ্টা, অনেক পরামর্শদাতা।” আজো বই সম্পর্কে এই মূল্যায়নের ব্যতিক্রম হয়নি, কোনোদিন হবেও না। বই চিরকাল মানুষের সবচেয়ে ভাল বন্ধু হয়েই পাশে থাকবে, পথ দেখাবে, যুগ থেকে যুগান্তরে, বংশ থেকে বংশানুক্রমিকভাবে। তা ছাপানো আকারেই হোক, কিংবা হালের “ইলেকট্রনিক বুক” সংস্কৃতির ডিভাইসের রূপান্তরে।
প্রসঙ্গক্রমে যদি ছাপানো বই এবং ই-বুকের মধ্যে একটা পার্থক্য টানা যায় তবে এটা নিশ্চিত করেই বলা চলে যে ছাপানো বইয়ের কদর এখনো সমান জনপ্রিয়, যতটা ই-বুক সংস্কৃতির পূর্বে ছিল। বিজ্ঞানের নিতা নতুন আবিস্কারের দৌলতে পৃথিবীতে যে সমস্ত বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে প্রকাশনার জগতে। মুদ্রন ব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন ধ্যান ধারণা যুক্ত হচ্ছে, আর প্রযুক্তির উদ্ভাবন এই বইয়ের ক্ষেত্রকেও নতুন আঙ্গিকে যুক্ত করছে। ই-বুক ব্যবস্থা তারই একটা অংশ। ব্যবহারিক দিক থেকে ই-বুক কিংবা ছাপানো বই-দুয়েরই ভাল-মন্দ উভয় দিক রয়েছে। এরই মধ্যে পাঠের জগতে ভবিষৎতে আরও নতুন পরিবর্তন আসতে পারে-এমন সম্ভাবনাকে স্বীকার করে নিয়েও বলা যায়, ছাপানো বইয়ের মলাটের ভাজে থাকা সুপ্ত সুগন্ধের অনির্বচনীয় সুখ আর কোথাও পাওয়া যাবে না৷
গুণগত দিক থেকে বই কীভাবে আমাদের সহায়তা করতে পারে তারই একটা সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা যাক এবার। প্রখ্যাত ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান লেখিকা ঝুম্পা লাহিড়ী বলেছিলেন- এটাই বইয়ের বিশেষত্ব, যা তোমাকে পা না নাড়িয়ে বিশ্ব ভ্রমণ করিয়ে দেয়।” বস্তুত তাই। নিউক্লিয়াস ফ্যামিলির যুগে একাকীত্বের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। তার এই একাকীত্ব দূর করার জন্য ২৪ ঘণ্টা একনিষ্ঠ। বন্ধুর ভূমিকায় থাকতে পারে বই। বই আমাদের কল্পনার জগতকে আলোকিত করে। বই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়তা করে। বই আমাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলে। বই আমাদের মধ্যে রুচিশীল, মার্জিত, অন্যায়বিযুক্ত মানসিকতা গড়ে তুলে ও মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। বই আমাদের শব্দভান্ডার বাড়ায়। বই আমাদের নতুন ভাষা শিখতে সাহায্য করে। বই আমাদের বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতাকে জাগিয়ে তোলে। বই আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে তীক্ষ্ণ করে তোলে। বই স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। বই শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ দূর করে। বই লেখার দক্ষতা বাড়ায়। বই আমাদের বিষয় এবং দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। বই আত্ম-উন্নতিতে সাহায্য করে। বই আমাদের যোগাযোগের দক্ষতা উন্নত করে। বই ইতিহাস রেকর্ড করে এবং সচেতনতা গড়ে তুলে। বই জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। হালে বই আভিজাত্যেরও নিদর্শন হয়ে উঠেছে। গোটা বিশ্বে সেলিব্রেটিদের ড্রয়িং রুমে ঘরে ঘরে সাজানো বইয়ের সমাহার অন্তত: তারই দৃষ্টান্ত বলা চলে !
প্রখ্যাত সাংবাদিক মার্গারেট ফুলার বলেছিলেন- “ আজ যিনি একজন পাঠক, আগামীকালের তিনি একজন নেতা”। অতএব নেতা হওয়ার পূর্বশর্তও এখন বই পড়া। হয়তো এ কারণেই কবি, সাহিত্যিক কিংবা বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক স্তরের নেতাদের বাড়ি ঘরে হালে শোভা পাচ্ছে একটি করে ব্যক্তিগত লাইব্রেরী কিংবা আভিজাত্যের প্রদর্শন স্বরাপ-বই মানুষের বিচ্যুতি ঠেকায়৷ এটাই সর্বজনস্বীকৃত, সর্বজনবিদিতও। একজন একনিষ্ঠ পাঠক কখনো হিংসা কিংবা অন্যায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারে না। এটা প্রমাণিত সত্য। তাই যত পারুন বই পড়ুন। প্রিয়জনকে উপহার দিন- যাকে একজন ভাল মানুষ হয়ে উঠতে দেখতে চান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *