ত্রিপুরা জুটমিলের সকল স্তরের শ্রমিক-কর্মচারী, পেনশনার, জীবিত বা মৃতার পরিবার বর্গ সুদীর্ঘ বঞ্চনার মধ্যদিয়ে দিন যাপন করছেন। কি কারনে তাদের এই বঞ্চনা এবং এই বঞ্চনা নিরসনে অতি দ্রুত রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করে আগরতলা প্রেসক্লাবে বৃহস্পতিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে ত্রিপুরা জুট মিল যৌথ আন্দোলন কমিটি।
আইনগত অধিকারে প্রাপ্য বেতন-ভাতাদি অন্যান্য ৩২টি সরকারী অধি গৃহীত সংস্থার (PSU) ন্যায় ১লা জানুয়ারী ১৯৯৬ইং তারিখ থেকে কার্যকর করার আজকের সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি জানান তারা। জুট মিল কর্তৃপক্ষ তাদের ২০৮নং বোর্ড (BOD) সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহন করে উক্ত ন্যায্য প্রাপ্য মিটিয়ে দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের নিকট পেশ করেছে। রাজ্যের উচ্চ আদালতে জুট মিল কর্মীদের দায়ের করা সকল মামলায়, ঐ বেতন-ভাতাদি মিটিয়ে দেওয়ার জন্য) মহামান্য বিচারপতিগন যথাক্রমে- অজয় রানী (৪/১/২০১৮ইং) ইন্দ্রজিত মহান্তি, সত্য গোপাল চট্টোপাধ্যায় (21/03/2022 ) রায় প্রদান করেছেন। সেখানে জুটমিল কর্তৃপক্ষ সহ সরকার-পক্ষ মিলে সেইসব রায়ের প্রতি সম্মান না জানিয়ে, উচ্চ বা উচ্চতর আদালতে আপিল মামলা দায়ের করেছেন বটে, সর্বক্ষেত্রেই তারা সম্পূর্নরূপে বিফল হয়েছেন এবং উভয়ে মিলে জুট মিল কর্মীদের বিধিসম্মত প্রাপ্য না দেওয়ার লক্ষ্যে নানা ধরনের ব্যর্থ ফন্দি এঁটে চলেছেন বলে অভিযোগ করেন তারা । সে কারণে সম্প্রীতি ত্রিপুরার উচ্চ আদালতে, আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করেন তারা । এই মামলা চলাকালীন অবস্থাতে, উভয় পক্ষ মিলে একটি নিস্ফলা স্পেশাল লিভ পিটিশন, মহামান্য জে কে মহেশ্বরী ও মহামান্য কে ভি বিশ্বনাথন বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের খণ্ডপীঠে দাখিল করেছেন বটে, সেই মামলা সুপ্রিম কোর্টের খন্ডপীঠ পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছেন । তাই, কালবিলম্ব না করে, তাদের প্রাপ্যের প্রাপ্ত অধিকার কার্যকরী করার জন্য জুটমিল কর্তৃপক্ষ তথা রাজ্য সরকারের নিকট দাবী রাখেন আজকের এই সাংবাদিক সম্মেলনে জুট মিল কর্মচারীরা।
বলা বাহুল্য, জুটমিল কতৃপক্ষ ও সরকার পক্ষ মিলে জুটমিলের প্রায় ৩০ কানির উপর অতি মূল্যবান ভূমি বিভিন্ন সংস্থার নিকট দান বা বিক্রী অব্যাহত রেখেছেন অথচ কর্মীদের পাওনা গন্ডা দেওয়ার ক্ষেত্রে হাই কোর্ট, সুপ্রীম কোর্টে দৌড়ঝাঁপের খামতি নেই বলে অভিযোগ করেন তারা। শুধু তাই নয় ঐ সব বিষয়ে উঁচু-নিচু সকল স্তরের মন্ত্রী বা আমলাদের প্রচুর সময় রয়েছে, কিন্তু জুটমিল কর্মীদের ন্যায্য প্রাপ্য সংক্রান্ত বিষয়ে প্রদত্ত আবেদন- নিবেদন নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে, সুদীর্ঘ সময়কালের মধ্যে এক সেকেন্ড বরাদ্ধের প্রয়াস সরকার বাহাদুর বা কোন স্তরে নিকট পাওয়া যায়নি বলেও তাদের অভিযোগ । অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট নির্দেশিত অধিকারে প্রাপ্ত বেতন-ভাতার বেনিফিট না দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাজ্য সরকার জুটমিল কর্তৃপক্ষকে দিয়ে জুটমিল কর্মীদের উপর নানা ধরনের হুজ্জতি করে চলেছেন ।
প্রথমত ঃ জুটমিলের উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ন বন্ধ করে রাখা হয়েছে । কর্মরত কর্মীদের স্ব- নির্ধারিত কাজ না দিয়ে যথেচ্ছভাবে- তাদেরকে দিয়ে জঙ্গল কাটানো, যত্রতত্র বদলী, প্রচলিত মহার্ঘভাতা বন্ধ করে রাখা, কথা বলার অধিকারকে জব্দ করা ইত্যাদী বঞ্চনা দাবিয়ে চলেছেন । কর্মীরা চায় জুটমিল চালু করে পূর্ব্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা হোক ।
দ্বিতীয়ত : জুটমিল কতৃপক্ষ সহ সরকারপক্ষ জুটমিল আবাসনে বৈধভাবে বসবাসরত শ্রমিক- কর্মচারীদের উচ্ছেদ আদেশ জারী করে, তাদের উপর অনর্গল উৎপাত, অশান্তি ও চাপ দিয়ে চলেছেন । এই উচ্ছেদ আদেশ থেকে কর্মরত কর্মীরা সহ জরুরী পরিসেবার নিয়োজিত যেমন- জুটমিল রক্ষী (Security Guard) জল সরবরাহ দপ্তরের কর্মী (Water Suply), বিদ্যুৎ দপ্তরের কর্মী (Electrical), সাফাই দপ্তরের কর্মীদের (Sweeping & Clinning) বিনা ভাড়ায় আবাসনে রাখার প্রাধান যেখানে বাধ্যতামুলক, সেখানে সেই সকল কর্মীদের উদ্দেশ্যে উচ্ছেদ আদেশ জারী করার মত ঘটনা এক বিরলতম দৃষ্টান্ত এবং আশ্চর্যজনক বটে , চাকুরী অস্তে জুটমিল কর্তৃপক্ষ যে নোটিশ ধরিয়ে দেন, তাতে উভয়ের লেন-দেন পরিস্কার হয়ে গেলে পরেই, ক্লিয়ারেন্স লেটার দিয়ে তার পোষ্ট রিটায়ারটমেন্ট বেনিফিট (Post Retirement Benefit) মঞ্জুর করার কথা বলা হয়েছে । আদালতের রায় অনুযায়ী তাদের লেনদেন এখনো জুটমিল কতৃপক্ষ মিটিয়ে দিতে পারেনি । অতএব জুটমিল কর্তৃপক্ষের এ সব তালবাহানা কোন অবস্থাতেই তারা মানতে পারছে না ।
তৃতীয়ত ৪ ১৯৪ নং বোর্ড সভায় কর্মরত কর্মীদের ন্যায়, অবসরপ্রাপ্ত কর্মী, মৃত কর্মীর পরিবার, ইত্যাদি সকলকেই আবাসনে বসবাস করার প্রবিধান রয়েছে, সেখানে তিন জনের প্রশাসনিক বোর্ডের ২৩৭ নং সভায় সেই প্রবিধান বাতিল করে দেওয়া কোন অবস্থাতেই সমীচীন হতে পারে না । কারন, ১৯৪ নং বোর্ডের উক্ত প্রাধানকে কেন্দ্র করে একটি মামলা এবং উচ্ছেদের উপর স্থগিতাদেশ (Injunction) জারী রয়েছে, সেখানে এই ব্যাপারে জুটমিলের ঐ প্রশাসনিক বোডের নতুন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহন করার নৈতিকতা নেই ।
চতুর্থত ঃ এখানে প্রকাশ থাকা আবশ্যক যে- জুটমিলের জনৈক অবসরপ্রাপ্ত কর্মী শ্রী ধনমনি সিংহ উক্ত অন্যায্য উচ্ছেদ আদেশ প্রত্যাহার তথা বাতিল করার জন্য আদালতে এক মামলা রুজ্জু করেছেন । মামলার নৈতিকতার কারনে, মহামান্য আদালত, ঐ সকল উচ্ছেদ আদেশের উপর স্থগিতাদেশ জারী করেছেন অথচ জুটমিল কর্তৃপক্ষ আদালতের সেই আদেশ অমান্য করে চলেছেন। এই মামলার কোন সদ-উত্তর দিতে না পেরে জুটমিল কর্তৃপক্ষ পি. ডাব্লু ডি (PWD) দপ্তরকে ডেকে এনে সারাটা মিলের বাড়ীগুলির স্থায়িত্ব কালের পরীক্ষা নিরীক্ষা করান । পি. ডাব্লু ডি দপ্তরের মন্তব্যে বলা হয়েছে যে- কারখানা ঘর সহ প্রশাসনিক দালান-ঘর তৎসঙ্গে আবাসনগুলিকে মেরামত নতুৱা সম্পূর্ন ভেঙ্গে ফেলে দিতে হবে। জুটমিল কতৃপক্ষ সেই মন্তব্যের কপি আদালতে পেশ করেছে ।
ফলে দেখা যাচ্ছে- ১৯৭৩ইং সনে প্রথমেই তৈরী হয়েছে কারখানা ঘর সহ এম. ডি মহোদয়ের নিজ ও প্রশাসন পরিচালনার সকল কার্যালয়গুলি এবং তার স্থায়িত্বকাল ৩০ বৎসর । এই স্থায়িত্বকাল ২০ বৎসর আগেই পূর্ণ হয়ে গিয়েছে । সেই হিসাবে ১০/১২ বৎসর অতিক্রান্ত হয়েছে আবাসনগুলির মেয়াদ । তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় যে- ২০ বৎসর পূর্বে জুটমিল কতৃপক্ষের চৈতন্য হলনা কেন ? তাতে করে জুটমিল কারখানা থাকবে কি থাকবে না, এই প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে । স্বয়ং এম ডি মহোদয় নিজেই বা কি করে মেয়াদ উত্তীন ঘরে বসে দপ্তর পরিচালনা করেন । কারখানা ঘর, অফিস ঘর বা আবাসন মেরামতি অথবা নতুন করে তৈরী করতে আমাদের কোন আপত্তি নেই, তবে সব ক্ষেত্রেই বিকল্প ব্যবস্থার বিধিবদ্ধ দায়ভার হল মালিক বা কর্তৃপক্ষের। সুতরাং আদালতের রায়কে অবমাননার লক্ষেই
জুটমিল কর্তৃপক্ষের এই সকল ফন্দি করে চলেছেন । যাইহোক, আদালতের রায় মোতাবেক ০১/০১/১৯৯৬ ইং তারিখের ভিত্তিতে প্রাপ্য মিটিয়ে না দিলে জুটমিলের ভিটেমাটি না ছাড়ব ছাড়ার হুমকি দেন আজকের এই সাংবাদিক সম্মেলনে জুট মিল কর্মীরা ।
পঞ্চমত: ১০৫৯ জন শ্রমিক-কর্মচারী ও পেনশনার আগরতলা ক্ষেত্রীয় পি এফ কমিশনারের আদেশ স্নেহা Ref. No. NE / AGT / 1339 / Accts / 4419, Dtd. 26/03/2012 অনুবলে হায়ার পেনশন পাওয়ার অধিকারী হয়েছেন । সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট থেকে এক বর্ধিত সুযোগ আসার পরেও জুটমিল কতৃপক্ষ যথাহৃতি প্রকাশ না করার ফলে বহু শ্রমিক- কর্মচারী ও পেনশনার অন লাইন করার নামে প্রচন্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। এখানে দাবী হল- আগরতলা ক্ষেত্রীয় পি এফ কমিশনারের আদেশ নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করা এবং যথা বিহীত কমিশনার মহোদয়কে অবহিত করা । আজকের এই সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি গুলি অতিসত্বর মানানো হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি দেয় তারা।
