খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো…

অভিজিৎ ভট্টাচার্য:
খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো…! সেই বিখ্যাত গান যা দোহার ব্যান্ডের শিল্পী প্রয়াত কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যের কন্ঠে অনেকটাই প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। গানটি শুনলেই যেন দুলে ওঠে মন। বিশেষ করে শীতের সময়। খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধা তোগো রসের জন্য। প্রকৃতির এক চমৎকার দান। আহা যেন অমৃত সুধা! কিন্তু শীত কোথায়? ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ চলছে কিন্তু দেখা নেই শীতের। এখনো ফ্যানের বাতাসে ঘুমোতে হচ্ছে। শীতকালটার আবহাওয়ার খামখেয়ালিতে  গাছগাছালিরাও যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না! কখন যে শীত নামবে, আবার কখন ঘূর্ণাবর্তনে পেছনে মুখ লুকোবে তা টের পাওয়া মুশকিল। জাকিয়ে শীত না পরার ফলে এ বছর খেজুর রসের খরা গাছে গাছে। হাঁড়ি বাঁধার  ছবিও প্রায় অদৃশ্য । তবুও কিছু কিছু জায়গায় খেজুর  গাছে ঝাড়া বাঁধার কাজে হাত লাগিয়েছেন ‘গাছি-ভাইরা । ভাল বাংলায় বলে ‘শিউলি’। এ সময় সিউড়িদের ব্যস্ততা চোখে পড়ারই কথা, সোনামুড়া বলুন, গোয়ালাবস্তির খেজুর বাগানই বলুন কিংবা কৈলাসহর বা বিলোনিয়াতেই বলুন। প্রাকৃতিক  বিজ্ঞান নিয়ে যাঁরা নাড়াচাড়া করেন, তাঁদের মতে, ১৫ ডিগ্রির নিচে পারদ না নামলে খেজুর গাছ থেকে রস বার করা যায় না। এবছর এখন পর্যন্ত শীতের দেখা না পাওয়ায় আগরতলার গোয়ালাবস্তি খেজুর বাগানের মুকেশ যাদবের মতো শিউলি বা গাছিদের মুখে হাসি অনেকটাই কম পাশাপাশি ব্যস্ততা ও কম। এই শীতকালটাতে ভালোই আমদানি হয় রস বিক্রি করে তাদের।কথা হচ্ছিল মুকেশের সঙ্গে। বহু বছর ধরে খেজুর বাগানে বিকেলে ঝাড় বাঁধেন, নলি বাসিয়ে হাঁড়ি ঝোলান। শীতের শিশিরভেজা ভোরে রসভর্তি হাঁড়ি নামান। নরম রোদ গায়ে মেখে শহরের শৌখিন প্রাতভ্রমণকারীদের রস খাওয়ান। কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, ‘বাবু, ই-বছর কুছ আচ্ছা হাল নেহি হ্যায়। রস বহুত হি কম মিল রহি হ্যায়। ঠান্ডা ইত্‌না কম, কে রসই নেহি হো রহা হ্যায়। বলছিলেন, অন্যান্য বছর এক গ্লাস রস বিক্রি করতেন ১০ টাকায়। কিন্তু এ বছর রস কম হওয়ায় বিক্রি করছেন ১৫ টাকায় এক গ্লাস। তাও চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছেন না। মুকেশের কথায়, বাবুরা সকালবেলা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে তিন-চার গ্লাস রস খেয়ে ফেলেন। এ বছর ভোরেই শেষ হয়ে যাচ্ছে রস। বাবুরা অনেক হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে একটি কথা মনে পড়ে গেল, দুদিন আগে ফেসবুকে এক বন্ধু একটি ছবি পোস্ট করেছিল। খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল বন্ধু এবং তার স্ত্রীকে। নিচে ক্যাপশন ছিল, খেজুরের রসের জন্য ঘুরছি। শীতের সময় খেজুর রসটা বেশ ভালই এবং চাহিদাও থাকে ভালো। রস কম হওয়ায় বাজারে এখনো সেভাবে দেখা যায়নি খেজুর গুড়। সোনামুড়া এলাকায় এ সময় খেজুর রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় সুগন্ধযুক্ত সুস্বাদু খেজুর গুড়। রস কম হওয়ায় গুড়ও হয়েছে কম এখন পর্যন্ত। এখন দেখার জাকিয়ে শীত পড়ে কিনা এবং মুকেশ যাদবদের মুখে হাসি ফুটে কিনা? ওঁর ভাষায়, “আগলে কুচ দিলো মে ঠান্ড আনে দিজিয়ে রস আয়েগা জাদা আওর ইনকাম ভি হোগা জাদা। কিন্তু পরিবেশ দূষণের ফলে যেভাবে আস্তে আস্তে রাজ্য থেকে শীত উধাও হয়ে যাচ্ছে ফলে হয়তো  কিছু বছর পর থেকে শুধু খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধার ছবি এবং বইয়ে পড়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে, ইতিহাস হয়ে যেতে পারে খেজুর গাছের সেই সুস্বাদু রস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *