মারাত্মক বিপর্যয়কারী নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রত্যাহার করো। সংকীর্ণ, সাম্প্রদায়িক ও পাশ্চাদপদ দৃষ্টিভঙ্গিতে নেওয়া পাঠ্যসূচি পরিবর্তন মানছি না। সকলের জন্য অগ্রগামী সমাজ নির্মাণের সহায়ক বিকল্প শিক্ষানীতি চাই। এসব আওয়াজ তুলে আগরতলায় শকুন্তলা রোডে সুকান্ত একাডেমির পাশে ব্যানার – পোস্টার – ফেস্টুনে সুসজ্জিত অস্থায়ী ছাউনিতে আজ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত শ্লোগান মুখরিত ৩ ঘন্টার গণ অবস্থান আয়োজিত হলো। ছাত্র -শিক্ষক -অধ্যাপক – বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক কর্মী সহ শিক্ষানুরাগীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
ছাত্র – শিক্ষক – অধ্যাপক, বিজ্ঞান – সাক্ষরতা – শিক্ষা- সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ১৮ টি সংগঠনের যৌথ মঞ্চ জয়েন্ট ফোরাম ফর মুভমেন্ট অন এডুকেশন ত্রিপুরা চ্যাপ্টার আয়োজিত এই গণ অবস্থানে বিভিন্ন বক্তারা সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের নেওয়া শিক্ষা ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচক কাজকর্ম ও পরিকল্পনার সমালোচনা করে আপামর জনগণকে এ বিষয়ে অবহিত করে ব্যপক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।তারা বলেন নতুন শিক্ষানীতির অভিমুখ হচ্ছে গ্লোবাল কর্পোরেট স্বার্থের অনুকূলে শিক্ষার লাগামছাড়া বেসরকারিকরণ। সাথে সংযুক্ত হয়েছে ভয়ঙ্কর সভ্যতা বিরোধী হিন্দুত্ববাদীদের সাম্প্রদায়িক প্রকল্প। এসবকে সহজ করতে অতিকেন্দ্রিকতাও।
বক্তারা বলেন নতুন শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন বৈষম্য বাড়াবে, বঞ্চনা বাড়াবে, স্কুলছুট – কলেজছুট বাড়াবে। আর্থসামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের পড়ুয়ারা এবং বিশেষকরে মেয়েরা শিক্ষা বঞ্চনার শিকার হবে। সাথে অপবিজ্ঞান চৰ্চা ও যুক্তি বিরোধিতা বাড়াবে।
ত্রিপুরা রাজ্যের শিক্ষা জগতের হালচাল তুলে ধরে বক্তারা বলেন তথাকথিত ডাবল ইঞ্জিনের ঠেলায় রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় লাঠে উঠেছে। নীতি অযোগ এবং সরকারেরই পছন্দের এন জি ও
‘ প্রথম ‘ তৈরি সর্বশেষ রিপোর্ট বলছে রাজ্যে স্কুল শিক্ষার গুণমানের অবনমন হয়েছে।সম্প্রতি সরকার উচ্চশিক্ষাতে বিশেষ করে কলেজগুলোতে নতুন শিক্ষানীতি চালুর আনুষ্ঠানিক সূচনা করেছে। প্রয়োজনীয় অনুসাঙ্গিক ব্যবস্থা না করেই এই বছর থেকেই নাকি একাধিক প্রবেশ – প্রস্থানের ব্যবস্থাসহ বহু বিষয় থেকে পাঠ্য বাছার সুযোগ দিয়ে ৪ বছরের স্নাতক কোর্স চালু হবে। তারা আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন ভর্তি থেকেই হ – য – ব – র -ল অবস্থা তৈরী হবে।শিক্ষার গুণগত মানও কমবে। নতুন নীতির ফলে সরকারি কলেজ বেসরকারি হাতে দেওয়া এমনকি সরকারি কলেজ তুলে দেবার সম্ভাবনাও আছে।
যদিও এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে স্কুল শিক্ষায় নতুন নীতি চালু হয় নি, নীতিটি খসড়া অবস্থায় থাকাকালীনই রাজ্য সরকার ওই নীতি অনুসারি কর্মসূচি নিয়েছে। বিদ্যাজ্যোতি স্কুল, বছরে দুবার সরকারি স্কুলের সম্পত্তি নিলামে তোলার নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রয়োজনীয় উপযুক্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা ছাড়াই বাংলা মাধ্যমের স্কুলকে ইংলিশ মিডিয়ামে রূপান্তর, ত্রিপুরা মধ্যেশিক্ষা পর্ষদকে দূর্বল করা এসব কর্মসূচি নিয়েছে রাজ্যের বি জে পি – আই পি এফ টি সরকার । বিদ্যাজ্যোতি স্কুল ব্যবস্থা এক দিকে যেমন বৈষম্যমূলক অন্যদিকে এই বিদ্যালয়গুলিতে পড়ুয়াদের কাছ থেকে ফিস নিয়ে বিনা বেতনে শিক্ষা পাবার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষক – শিক্ষিকা ঘাটতি এক বড় সমস্যা যা সমাধানে কার্যকরী পদক্ষেপ নেই, শুধু কথার ফুলঝুরি। উপজাতি এলাকায় শিক্ষার অব্যবস্থা আরও মারাত্মক।গণ অবস্থানের বক্তারা নতুন নীতিতে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের ভূমিকাকে খাটো করে প্রাক প্রাইমারি স্তরেও যে ব্যপক বেসরকারি আয়োজনের আবহ নির্মাণের অভিপ্সা আছে তার নিন্দা করেন।
ভাষা ও সংস্কৃতি প্রশ্নে আগ্রসনের মনোভাব, ‘ হিন্দি – হিন্দু – হিন্দুস্তানে’র সওয়াল এবং রাজ্যের উপজাতি জনগোষ্ঠীর ভাষা ককবরকের লিপি প্রশ্নে সুড়সুড়ি ও হিন্দুত্ববাদীদের অবিবেচনা প্রসূত সওয়ালেও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন যতদিন পর্যন্ত না লিপি প্রশ্নে সঠিক যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হয় ততদিন পড়ুয়াদের বাংলা ও রোমান উভয় লিপি ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা চলবে না।
অধ্যাপক মিহির দেব, অধ্যাপিকা আল্পনা সেনগুপ্ত, অধ্যাপক হারাধন দেবনাথ, অধ্যাপক ভূপাল সিনহা ও স্বপন বল কে নিয়ে গঠিত সভাপতিমন্ডলীর সভাপতিত্বে এই গণ অবস্থানে বক্তব্য রাখেন টি এস ইউ -এর সম্পাদক সুজিত ত্রিপুরা, এস এফ আই রাজ্য সম্পাদক সন্দীপন দেব, শিক্ষক নেতা শৈবাল রায়, ত্রিপুরা ইউনিভার্সিটি টিচার্স এসোসিয়েশনের সহ সম্পাদক উৎপল চন্দ্র দে এবং টি সি টি এ – র পক্ষে অধ্যাপক নিত্যানন্দ দাস।
প্রারম্বিক বক্তব্য রাখেন জয়েন্ট ফোরাম ফর মুভমেন্ট অন এডুকেশন ত্রিপুরা চ্যাপ্টারের কনভেনরস – কোঅর্ডিনেটর ড. মিহিরলাল রায়।উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন ত্রিপুরা সংস্কৃতি সমন্বয় কেন্দ্রের শিল্পীরা। বাচিক শিল্পী উত্তম চক্রবতী আবৃতি এবং পিয়ালী চৌধুরী সংগীত পরিবেশন করেন । সভাপতি মন্ডলীর পক্ষে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক হারাধন দেবনাথ।
